ফোনের কম্পাস কেন ভুল দেখায়? চৌম্বক অবনতি ও ক্যালিব্রেশন

কিবলা অ্যাপগুলো ফোনের কম্পাসের উপর নির্ভর করে, আর সেই কম্পাস সবসময় সঠিক নয়। একই ঘরের দুটি ফোন ভিন্ন দিক দেখাতে পারে, কিংবা টেবিল থেকে ফোন তুলতেই কাঁটা পনেরো ডিগ্রি সরে যেতে পারে। কারণটি অ্যাপ নয়, ফোনের ভেতরের সেন্সরের পদার্থবিদ্যা ও তার চারপাশ। নিচে ভুলের উৎস এবং প্রতিটির সমাধান দেওয়া হলো।

চৌম্বক উত্তর আর প্রকৃত উত্তর এক নয়

কম্পাসের কাঁটা ভৌগোলিক উত্তর মেরু নয়, চৌম্বক উত্তর দেখায়, আর দুইয়ের মাঝে একটি কোণ থাকে। একে বলে চৌম্বক অবনতি। এটি অবস্থানভেদে বদলায়: তুরস্কে প্রায় ছয় ডিগ্রি পূর্বে, পশ্চিম ইউরোপে শূন্যের কাছাকাছি, উত্তর আমেরিকার পূর্বে পনেরো ডিগ্রির বেশি। সময়ের সঙ্গেও এটি সরে যায়, বছরে প্রায় দশ ভাগের এক ডিগ্রি। তাই যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ কিবলা যন্ত্রকে কাঁচা কম্পাস পাঠ সংশোধন করতেই হয়।

ফোনের ভেতরের সেন্সর: ম্যাগনেটোমিটার

ফোনে একটি ছোট ম্যাগনেটোমিটার থাকে যা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র তিনটি অক্ষে মাপে। সেই ক্ষেত্র খুবই দুর্বল, প্রায় পঁচিশ থেকে পঁয়ষট্টি মাইক্রোটেসলা। এত দুর্বল সংকেত কাছের যেকোনো ধাতুর টুকরো ও যেকোনো বৈদ্যুতিক প্রবাহে বিঘ্নিত হয়। ফোন হেলানোর হিসাব রাখতে অ্যাক্সিলারোমিটারও ব্যবহার করে এবং যন্ত্র সমতল না থাকলে পাঠ গাণিতিকভাবে সংশোধন করে, তবে সেই সংশোধনও নিখুঁত নয়।

সবচেয়ে সাধারণ কারণ: কাছের চুম্বক ও ধাতু

কম্পাসের অধিকাংশ ভুলের উৎস একটিই: ফোনের কাছাকাছি একটি চুম্বক। চুম্বকযুক্ত কেস, গাড়ির চুম্বক হোল্ডার, ল্যাপটপের স্পিকার, ইয়ারবাড কেস আর ফ্রিজের দরজা সহজেই কাঁটা পনেরো-বিশ ডিগ্রি সরিয়ে দেয়। কংক্রিট ভবনের ইস্পাত রড, লিফট, ট্রেন ও গাড়ির কাঠামোও একই কাজ করে। সহজ পরীক্ষা: ফোন হাতে নিয়ে ঘরের মাঝখানে ধাতু থেকে দূরে যান এবং দেখুন পাঠ বদলায় কি না।

ক্যালিব্রেশন: বাতাসে আট আঁকা

ম্যাগনেটোমিটার সময়ের সঙ্গে সরে যায় এবং পুনরায় সেট করা দরকার হয়। উপায় হলো ফোন হাতে নিয়ে বাতাসে কয়েকবার আট সংখ্যাটি আঁকা, সেই সঙ্গে যন্ত্রটিকে তিনটি অক্ষেই ঘোরানো। এতে কয়েক সেকেন্ড লাগে এবং অধিকাংশ ফোনে পাঠ লক্ষণীয়ভাবে ভালো হয়। কম্পাস অনবরত দুলতে থাকলে বা দিক অযৌক্তিক মনে হলে সবার আগে এটিই করা উচিত।

ফোন সমতলভাবে ধরুন

ম্যাগনেটোমিটারের পাঠ যন্ত্রের অবস্থানের উপর নির্ভর করে। ফোন খাড়া বা হেলানো থাকলে সফটওয়্যার তা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু কোণ বাড়ার সঙ্গে ভুলও বাড়ে। সবচেয়ে নির্ভুল ফল পাওয়া যায় ফোনটি হাতের তালুতে সমতলভাবে, পর্দা উপরের দিকে রেখে ধরলে। একই কারণে গাড়ির ড্যাশবোর্ডে বা ঢালু পৃষ্ঠে রাখা ফোন থেকে দিক পড়া নির্ভরযোগ্য নয়।

কতটুকু ভুল স্বাভাবিক?

ক্যালিব্রেট করা এবং ধাতু থেকে দূরে থাকা ফোনে সাধারণত পাঁচ ডিগ্রির মতো নির্ভুলতা পাওয়া যায়। কাছে চুম্বক থাকলে ভুল পনেরো-বিশ ডিগ্রি, আর ইস্পাত কাঠামোর ভবনে তারও বেশি হতে পারে। কিবলার ক্ষেত্রে মাত্রাটি জানা কাজে দেয়: কাবা থেকে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরে পাঁচ ডিগ্রি ভুল ভূপৃষ্ঠে কয়েকশো কিলোমিটার সরে যাওয়ার সমান। ধ্রুপদী সূত্রে বলা হয়, যিনি কাবা দেখতে পান না তাঁর জন্য সাধারণ দিকে মুখ করাই যথেষ্ট; তবুও সম্ভাব্য সবচেয়ে নির্ভুল দিক খোঁজাই লক্ষ্য থাকে।

কম্পাস ছাড়া যাচাই: সূর্য যখন কাবার ঠিক উপরে

বছরে দুবার সূর্য ঠিক কাবার উপর দিয়ে যায়। সেই মুহূর্তগুলোতে পৃথিবীর যেখানেই সূর্য দেখা যায়, সূর্যের দিকে মুখ করলেই কিবলার দিকে মুখ করা হয়। তারিখ দুটি হলো ২৭-২৮ মে সময় ১২:১৮ এবং ১৫-১৬ জুলাই সময় ১২:২৭ (মক্কার সময়)। সেই মিনিটে খাড়া লাঠির ছায়া ঠিক কিবলার বিপরীত দিক দেখায়। এটিই সবচেয়ে নিশ্চিত পদ্ধতি, কোনো যন্ত্র লাগে না এবং কোনো চৌম্বক বিঘ্ন একে নষ্ট করতে পারে না।

দ্বিতীয় উপায়: মানচিত্রে যাচাই

কম্পাসের উপর একেবারেই ভরসা করতে না চাইলে আপনার অবস্থান ও কাবার মধ্যে টানা মহাবৃত্তের রেখাটি দেখুন। মানচিত্রে এই রেখা প্রায়ই বাঁকা দেখায়; এটি ভুল নয়, গোলকের পৃষ্ঠে সবচেয়ে ছোট পথের সমতল মানচিত্রে অভিক্ষেপ। পরিচিত রাস্তা বা ভবনের ধারের সঙ্গে মিলিয়ে দিকটি ঠিক করে নিতে পারেন, পরে ঘরের ভেতরে সেই একই দিক আবার খুঁজে নিতে পারেন।

QiblaTap এটি কীভাবে সামলায়?

প্রতিটি শহরের পাতায় আমরা দুটি কোণ পাশাপাশি দেখাই: প্রকৃত উত্তরের সাপেক্ষে কিবলার কোণ, এবং সাধারণ চৌম্বক কম্পাসে আপনার যে কোণ পড়া উচিত। দুইয়ের পার্থক্যই সেই শহরের অবনতি, যা ওয়ার্ল্ড ম্যাগনেটিক মডেল থেকে হিসাব করা এবং পাতাতেই লেখা থাকে। কম্পাস কাজ না করলে বা তাতে ভরসা না থাকলে একই পাতায় মানচিত্র দৃশ্য ও সূর্য পদ্ধতিও আছে। ফলে আপনি কখনোই একটিমাত্র সেন্সরের উপর নির্ভরশীল থাকেন না।

→ কিবলার দিক — লাইভ কিবলা কম্পাস